বইটির নাম নারী বিরোধী মিডিয়া
লেখক : জব্বার হোসেন
প্রকাশনী : পার্ল পাবলিকেশন্স
প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম : ধ্রব এষ
মূল্য : ১৫০ টাকা
লেখকের কথা :
কোন চিন্তা থেকে বইটি লিখেছেন ?
বইটির নাম নারী বিরোধী মিডিয়া। আমাদের মিডিয়া কখনো কখনো প্রচন্ড পুরুষ আচরন করে। পুরষতান্ত্রিকতায় ভোগে। ভোগায় নারীদের। এই দুর্ভোগটি আহত করে আমাকে। যদি বিশ্বাস করি সমতায়, সমানাধিকারে, তবে এর প্রতিবাদ করা উচিৎ প্রত্যেকেরই। মিডিয়া উদার হোক, আধুনিক হোক, সমতায় বিশ্বাস করুক, নারীদের পুজির স্বার্থে পন্য না করুক। এই চিন্তা থেকেই বইটি লেখা।
কিভাবে লিখেছেন ?
আমার লেখার বিষয় চারপাশ। গনমাধ্যমে কাজ করছি দীর্ঘদিন। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা অনেকদিনের। এই অনেকদিনের অভিজ্ঞতাগুলোই এক করেছি। চারপাশে যা দেখেছি, নারীদের যেভাবে দেখেছি, সম্পাদকদের কক্ষ থেকে শুরু করে রিপোর্টারের কম্পিউটারে হেনস্থা হতে, হয়রানী হতে সেসবই লিখেছি। আমরা বলি কিন্তু বিশ্বাস করিনা সমতায়। এখনো, গনমাধ্যম বানিজ্যিক কারণে, মেয়েদের ভাবি পণ্য, যৌনবস্তু, এক ধরনের উত্তেজনা যা আমাদের পত্রিকা বিক্রি করতে সহায়তা করবে। এমন বিষয় আর ঘটনাগুলোর সমালোচনাই এই বই।
কেনো পাঠক বইটি পড়বে ?
যদি সত্যিকার আধুনিক মানুষ বলে কোন পাঠক নিজেকে ভাবে তবে সে সমতায় বিশ্বাস করবে। নারী বা পুরুষ ভিন্ন কিছু নয়। আমার কাছে একই- মানুষ। আমি নিজেকেও কখনো পুরুষ মনে করি না। প্রচলিত অর্থে যে পুরুষ সেই পুরষ আমি নই। আমি একজন মানবিক মানুষ। আমার ধর্ম মানবতাবাদ। যে পাঠক বেদনার্ত হন বৈষম্যে সে পাঠক বইটি পাঠ করবেন নতুন দিনের নতুন গ্রন্থ মনে করে। বইটি আসলে কোন সাধারন বই নয়। মানবতাবাদের, বৈষম্যহীনতার পাঠ।
জব্বার হোসেন : সম্পাদক, সাপ্তাহিক কাগজ
বইয়ের নাম : মোখলেস ভাই উপাখ্যান
লেখক : বিশ্বজিত দাস
প্রকাশক : অবসর
প্রচ্ছদ : আরাফাত রুমি
পৃষ্ঠা : ৯৬
মূল্য : ১৫০ টাকা
বইয়ের নাম : শার্লক হোমসের বিয়ে
লেখক : বিশ্বজিত দাস
প্রকাশক : সিড়ি প্রকাশন
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চৌধুরি তুলি
পৃষ্ঠা : ৬৪
মূল্য : ১২৫ টাকা
সোয়া দুইশত বছর আগের ত্রিপুরার রাজসভার এক বাইজিকে নিয়ে রচিত রাজনটী। লোকপুরাণ মতে, তার নাম নূরজাহান হলেও লেখক তার নাম দিয়েছেন গুলনাহার। মধ্য বয়সে গুলনাহার তার নিজ গ্রামে ফিরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। কিন্ত মানুষ যখন জানল সে বাইজি, তখন কেউ মসজিদটিতে নামাজ পড়ল না – এই হচ্ছে উপন্যাসটির মূল কাহিনি। ১৭৭৪ এর ভয়াবহ মন্বন্তরের কালে গুলনাহারকে এক গোয়ালার কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলে তার মা । সাবালিকা হওয়ার পর গোয়ালা তাকে বিক্রি করে দেয় সাবেরি নামক এক বাইজির কাছে। তার কাছে নাচ-গান রপ্ত করে ত্রিপুরার মহারাজ দ্বিতীয় রাজধর মানিক্যের রাজসভার রাজবাইজির পদাধিকারী হলো গুলনাহার। বহু বছর রাজবাইজি বা রাজনটী হিসেবে থেকে মহারাজের চিত্ত মনোরঞ্জনের পর একদিন তার ভাই কর্তৃক লাজ্ছিত ও মহারাজ কর্তৃক ভতসনার শিকার হয়ে গুলনাহার নীরবে কোঠা ত্যাগ করে চলে আসে নিজ গ্রাম হরিদশ্বে। মাহারাজ পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে গুলনাহারের জন্য বহু ধনরত্ন ও নগদ টাকা পাঠিয়ে দেয়। গুলনাহার অতীত জীবনের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য নিজ গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণ করে। গ্রামবাসী তখনো জানত না, গুলনাহার এক বাইজি। কিন্ত মসজিদের কাজ যখন পুরোপুরি শেষ হলো, তখন বিষয়টি আর তাদের কাছে গোপন থাকল না। ফলে কেউ আর বাইজি কর্তৃক নির্মিত মসজিদে নামাজ পড়ল না। সবার কাছে লাঞ্ছিত অপমানিত হয়ে গুলনাহার আবার ফিরে যায় তার পুরোন বাইজি পেশায়।
ইতিহাস, লোকপুরাণ আর কল্পনার ধার ঘেঁষে চলে যাওয়া উপন্যাস রাজনটী। কল্পনা বাদ দিয়ে হুবহু কোনো ঘটনার বিবরণ দেয়া ঐতিহাসিকের কাজ, ঔপন্যাসিকের নয়। কাহিনীতে প্রাচীনত্বের আমেজ আনার স্বার্থে কিছু স্থানের প্রাচীন নাম ও ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন ত্রিপুরা রাজ্যকে ‘জাজিনগর’ বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, একদা ত্রিপুরার নাম জাজিনগর ছিল বটে। ভারতের প্রাচীন লেখকগণ এ রাজ্যকে ‘জাজনগর’ বা ‘জাজিনগর’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। ঐতিহাসিক স্টুয়ার্ড রচিত বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে আছে, ‘১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্মণাবতীর নবাব তুগ্রল খাঁ অনেক সৈন্য-সামন্ত নিয়ে জাজিনগর আক্রমণ করেন। তিনি সেখানকার রাজাকে পরাভূত করে সেই রাজ্যে লুণ্ঠন চালান এবং সেখান থেকে প্রভূত সম্পদ ও এক শত হাতি নিয়ে চলে যান।’ (রাজমালা ও আধুনিক ত্রিপুরা : শ্রীপুরঞ্জনপ্রসাদ চক্রবর্তী)। এই জাজিনগরই হচ্ছে বর্তমান ত্রিপুরা।
অপরদিকে, ত্রিপুরার প্রাচীন রাজধানী উদয়পুরকে ‘জয়গুনপুর’, তৎপরবর্তী রাজধানী আগরতলাকে ‘উদয়াচল’ ছদ্মনামে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইভাবে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় পটভূমি মাঝিগাছা গ্রামকে ‘হরিদশ্ব’ ছদ্মনাম রাখা হয়েছে। রঙসোনাপুর স¤পূর্ণতই কথকের কল্পনাপ্রসূত এক নগর। আর সুধাবতী যে গোমতীরই কল্পিত নাম¯পাঠক নিশ্চয়ই তা আন্দাজ করতে পেরেছেন। কমলাঙ্ক কুমিল্লারই আদি নাম। চৈনিক পরিব্রাজক ওয়াং চোয়াং সমতট রাজ্য পরিভ্রমণ বৃত্তান্তে কিয়া-মল-ঙ্কিয়া নামক যে জনপদের বর্ণনা দিয়েছেন সেটাই কমলাঙ্ক, যা বর্তমানের কুমিল্লা। আর নটীর মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা যে নূরজাহান, তা এ জনপদের সবারই জানা কথা। সচেতনভাবে এ নামটি পরিহার করে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম রাখা হয়েছে গুলনাহার।
রাজনটী
লেখক : স্বকৃত নোমান। saqritobd@gmail.com
। ০১৮১৮ ২৩৮৩২০
প্রকাশক : ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
। ৩৮/৩ বাংলা বাজার, ঢাকা – ১১০০
। ittadisutrapat@yahoo.com
। ৭১২৪৭৬০, ০১৭১৫ ৪২৮২১০, ০১৭১২ ২৩৫৩৪২
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১১
প্রচ্ছদ : নিয়াজ চোধুরী তুলি
পৃষ্ঠা : ১৭৫
মূল্য : ২০০ টাকা
লেখক পরিচিতি
স্বকৃত নোমান ১৯৮০ খৃস্টাব্দের ৮ নবেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সাগর-নদী আর পর্বতময় ব্যাপ্ত ভূখন্ডে কেটেছে তার জীবনের পঁচিশ বছর। মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া, ছোটফেনী নদীর কূলে কূলে আর বঙ্গোপ সাগরের আদিগন্ত প্রসারিত চরে হাঁটতে হাঁটতে এই জনপদের আদিবাসী, বাঙালি, মুসলমান, বৌদ্ধ, হিন্দু―বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীভূক্ত মানুষের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দেখতে দেখতে নিজেকে করে তুলেছেন যশস্বী, তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার লাভ করেছে বিপুল বিস্তার। বর্তমানে তিনি ঢাকায় দেশের প্রতিষ্ঠিত একটি সংবাদ ম্যাগাজিনে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি নিবিষ্ট পাঠক ও প্রতিশ্রুতিশীল লেখক। এ প্রজন্মের কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে স্বকৃত নোমানের অবস্থান এখন পরিষ্কার। নিয়ত অনুসন্ধিৎসু এ তরুণ কোনো তত্ত্বে বিশ্বাসী নন। ধর্মতত্ত্ব সঠিকভাবে জেনে তারপর সচেতনভাবে নিজেকে এর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন, পাশাপাশি উগ্র নাস্তিকতা থেকেও সমান দূরত্ব বজায় রাখেন। চিরন্তন সত্য বলে পৃথিবীতে কিছু নেই―এই তার আপাত প্রস্তাব।
প্রকাশিত উপন্যাস : নাভি (২০০৮), ধুপকুশী (২০০৯), জলেস্বর (২০১০)। প্রবন্ধ : প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (২০০৯), খ্যাতিমানদের শৈশব (২০১০)। তিনটি উপন্যাস লেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজনটীতে এসে তিনি অনেক বেশি পরিণত। নির্মাণ করেছেন অভিনব আঙ্গিক আর অনবদ্য ভাষা।
শহীদ জননীর কথা
জাহানারা ইমাম শহীদ জননী, লেখিকা, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি। একাত্তরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন।পরবর্তীতে তাকেঁ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন৷ জাহানারা ইমাম হন ‘শহীদ জননী’।
জাহানারা ইমামের জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ মে। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। তাঁর ডাক নাম ছিল জুড়ু । জাহানারা ইমামের বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম। জাহানারা ইমাম মাট্রিক পাস করেন ১৯৪২ সালে। ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করে তিনি ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে। সেখান থেকে বিএ পাস করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৬০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৬৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করেন।
জাহানারা ইমাম শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ময়মনসিংহ শহরের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে। সেখানে সহকারী শিক্ষক হিসেবে ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, বুলবুল একাডেমী কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রভাষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন।
রংপুরের ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শরীফুল আলম ইমাম আহমদের সঙ্গে জাহানারা ইমামের বিয়ে হয় ১৯৪৮ সালে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর প্রথম সন্তান রুমী দেশকে শত্র“মুক্ত করার শপথে ঘর ছাড়েন। দুঃসাহসী গেরিলা ছিলেন তিনি। এক সময় পাকিরা অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে রুমীকে হত্যা করে।
জাহানারা ইমামের স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়েও পাকিস্তানিরা নির্মম নির্যাতন চালায়। বিজয়ের মাত্র তিনদিন পূর্বে তিনি ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে জাহানারা ইমাম মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।
২৯ ডিসেম্বর ১৯৯১ সাল। গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ঘোষণা করা হয়। ফলে সূত্রপাত হয় জনবিক্ষোভের। বিক্ষোভের অংশ হিসাবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারিতে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে ১১ ফেব্রুয়ারিতে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম।
জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। এই গণআদালতের সদস্য ছিলেনঃ এডভোকেট গাজিউল হক, ড: আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লে: কর্ণেল (অব:) কাজী নুরুজ্জামান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার শওকত আলী খান।
গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অ-জামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২ এপ্রিল ১৯৯২ সালে গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবিসংবলিত স্মারকলিপি পেশ করেন জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে। ১০০ জন সাংসদ গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেন। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপি গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়।
২৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেত্রত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এই ঘৃণ্য আটজন যুদ্ধাপরাধীর নামঃ আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মো: কামরুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আবদুল কাদের মোল্লা।
২৮ মার্চ ১৯৯৩ সালে নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশ হামলা চালায় । পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম, এবং তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে।
২৬ মার্চ ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। এ সময় শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে জাহানারা ইমামকে চিকিৎসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্টয়েট হাসপাতালে নেয়া হয়। ২৬ জুন ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্টয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালের বেডে ৬৫ বছর বয়সে জাহানারা ইমাম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যে দাবীতে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তাই আজ বাস্তবায়নের পথে। যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। ইত্যেমধ্যে মানবতা বিরোধী অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের।
জাহানারা ইমামের লেখা বইয়ের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ (১৯৮৫), একাত্তরের দিনগুলি (১৯৮৬), গজকচ্ছপ (১৯৬৭), সাতটি তারার ঝিকিমিকি (১৯৭৩), একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি (১৯৮৯), জাগ্রত ধরিত্রী (১৯৬৮), তেপান্তরের ছোট্ট শহর (১৯৭১), নদীর তীরে ফুলের মেলা (১৯৬৬), অন্য জীবন (১৯৮৫), জীবন মৃত্যু (১৯৮৮), ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস (১৯৯১) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
তথ্য ও ছবি : সংগৃহীত
إرسال تعليق